<![CDATA[
ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যারা তাদের দেশ এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অমোচনীয় চিহ্ন রেখে গেছেন। এমনই একজন আলোকিত ব্যক্তিত্ব হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একজন অকুতোভয় নেতা, যার দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং ন্যায় ও সাম্যের প্রতি অটল অঙ্গীকার বাংলাদেশকে কেবল স্বাধীন করেননি, দেশের ভাগ্যকেও বদলে দিয়েছেন।
প্রায়শই তাকে কেবল ‘বঙ্গবন্ধু’ বলেই উল্লেখ করতে শুনা যায়। শব্দটির অর্থ ‘বাংলার বন্ধু। তার পুরো জীবনটাই ছিল সাহস, সহনশীলতা আর জনগণের জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য নিরলস প্রচেষ্টার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বর্তমান বাংলাদেশের টুঙ্গিপাড়ার ছোট্ট গ্রামে জন্ম নেয়া শেখ মুজিবুর রহমান একসময় পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ক হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন একজন যাদুকরী বক্তা; তার অসাধারণ বাগ্মিতা ও আবেগ বাঙালির আকাঙ্ক্ষার সাথে গভীরভাবে অনুরণিত হয়েছিল, তাদেরকে অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটি অদম্য শক্তিতে পরিণত করেছিল।
১৯৪০-এর দশকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক যাত্রা গতি লাভ করে। এ সময় তিনি বৃহত্তর পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে বাঙালির অধিকার ও সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। তিনি নির্ভিক চিত্তে স্বায়ত্তশাসন ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করেন।
আরও পড়ুন: পিটিআইকে আইনমন্ত্রী /বঙ্গবন্ধুর খুনিদের যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে
বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার নেতৃত্ব তাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। আন্দোলনটি ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে মর্মান্তিক প্রাণহানির মধ্যদিয়ে শেষ হয়। এটি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং বিশ্বজুড়ে পালিত হয়।
এরপর পরবর্তী বছরগুলোতে বঙ্গবন্ধুর প্রভাব ক্রমাগত বাড়তে থাকে। একসময় বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তার দল আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। যা আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশা জাগিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু যখন পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠী তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করল, তখন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠল। এরপর এলো সেই চরম মুহূর্তটি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক এক ভাষণের মাধ্যমে দেশবাসীকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানালেন।
স্বাধীনতার দাবিতে পরিস্থিতি যখন আরও উত্তপ্ত হতে থাকল, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পশ্চিম পাকিস্তান নৃশংস সামরিক অভিযান শুরু করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। তার ক্যারিশমা, কৌশলগত প্রজ্ঞা ও অদম্য মনোবল মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালির প্রধান চালিকাশক্তি। যারা সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে।
আরও পড়ুন: জাতীয় শোক দিবস আজ
ঐতিহাসিক এ সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, যখন পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বদেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
নতুন জাতির স্থপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু দেশ পুনর্গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তার গৃহীত নীতির লক্ষ্য ছিল আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, ভূমি সংস্কার ও সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন। তার ঐতিহাসিক ‘ছয়-দফা আন্দোলন’ একটি ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অঞ্চলগুলোকে উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে জঘন্য ও নির্মম এক সহিংসতার মধ্যদিয়ে তার সেই ঐতিহাসিক যাত্রার ইতি ঘটে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কয়েকজন বিপথগামী কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করে। মর্মান্তিক এ পরিণতি সত্ত্বেও তার উত্তরাধিকার এখনও অব্যাহত রয়েছে। তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা তার স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইকনিক মর্যাদা আজও অমলিন। তিনি শুধু জাতির পিতা নন, তিনি বাঙালির স্থিতিশীলতা, সাহসিকতা ও অটুট চেতনার প্রতীক। তার জীবন ও কর্ম প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
আরও পড়ুন: সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা /একদিনেই বদলে যায় পত্রিকার শিরোনাম
যারা সত্য ও ন্যায়বিচার, সমতা ও এক উন্নত বিশ্বের জন্য লড়াই করছে, তাদের জন্য তিনি দিশারি হয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধুর অদম্য চেতনা আজও বেঁচে আছে, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃত মহত্ব নিহিত রয়েছে মানবতার সেবা ও মহৎ আদর্শের অবিচল সাধনায়।
]]>

